বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমাদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে
Make a 16:9 image of We need to give importance to science and technology in Bangladesh.

আধুনিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস মূলত বৈজ্ঞানিক সক্ষমতারই ইতিহাস। বিশ্ব অর্থনীতিতে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালি অবস্থানে রয়েছে তাদের কর্মকান্ড একটু গভীর ভাবে নজর দিলে বুঝতে পারবো যে তাদের সফলতা শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান বা জনসংখ্যার আকার এর কারণে নয়, বরং এটি নির্ধারিত হয় প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন, অভিযোজন এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষমতার ওপর। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন একটি আমূল পরিবর্তন বা ‘প্যারাডাইম শিফট’। বর্তমানে শ্রম ও পুঁজি-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বাংলাদেশকে সরে আসতে হবে ‘টোটাল ফ্যাক্টর প্রোডাক্টিভিটি’ বা মোট উপাদান উৎপাদনশীলতার দিকে—অর্থনীতির ভাষায় যার সমার্থক হলো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কোনো বিলাসদ্রব্য নয় যা ধনী হওয়ার পর অর্জন করতে হয়; বরং এটিই সম্পদ তৈরির মূল ইঞ্জিন। গত অর্ধশতাব্দীর এশীয় অর্থনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো—যাদের অবস্থা একসময় বাংলাদেশের মতোই বা আরও খারাপ ছিল—বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দারিদ্র্য বিমোচন করেছে এবং সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই বিশ্লেষণ কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং এটি সরকার, বেসরকারি খাত এবং নাগরিকদের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু এবং সত্যেন বোসের মতো বিজ্ঞানীদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যের পুনজাগরণ ঘটিয়ে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’-এর রূপকল্প বাস্তবায়ন করা 1।

এই রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা এখন অনস্বীকার্য। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4IR) যত ত্বরান্বিত হচ্ছে, আমাদের পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি ততই বাড়ছে। অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়করণ আমাদের তৈরি পোশাক (RMG) খাতের সস্তা শ্রমের সুবিধাকে হুমকির মুখে ফেলছে। মধ্যম আয়ের ফাঁদ (Middle-Income Trap) এড়াতে এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের এই কৌশলগত পরিবর্তন অপরিহার্য।

ব্যবধানের একটি তুলনামূলক অর্থনৈতিক ইতিহাস

আমাদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের বিশালতা বুঝতে হলে প্রথমে ঐতিহাসিক তথ্যের দিকে তাকাতে হবে। চল্লিশ বছর আগে বাংলাদেশ এবং তার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশীদের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল, কিন্তু তা পূরণ করা অসম্ভব ছিল না। পরবর্তী সময়ে যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা অনিবার্য ছিল না; বরং তা ছিল শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিগত নীতিমালার ভিন্নতার ফল।

১.১ আশির দশকের প্রেক্ষাপট

১৯৮০-এর দশকের শুরুতে এশিয়ার অর্থনৈতিক দৃশ্যপট ছিল পরিবর্তনশীল। স্বাধীনতা যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশ তখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। একইভাবে ভিয়েতনামও দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসছিল।

সে সময়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জীবনযাত্রার মানে এই দেশগুলোর মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯০ সালে ভিয়েতনামের মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ৯৫ ডলার, যা বাংলাদেশের ৩০৩ ডলারের চেয়েও কম ছিল 3। কিন্তু পরবর্তী তিন দশকে হাই-টেক বা উচ্চ-প্রযুক্তি এবং ইলেকট্রনিক্স খাতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (FDI) ওপর ভিত্তি করে ভিয়েতনাম কেবল বাংলাদেশকেই ধরে ফেলেনি, বরং অনেকটা ছাড়িয়ে গেছে।

সারণী ১: তুলনামূলক অর্থনৈতিক গতিপথ (মাথাপিছু জিডিপি – নমিনাল)

Science & Tecnology in Bangladesh
উৎস: আইএমএফ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক এবং ঐতিহাসিক ডেটাসেট 4। সারণীর উপাত্তসমূহ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ভিয়েতনামের অভূতপূর্ব উত্থান এবং কোরিয়ার আকাশচুম্বী সাফল্য।

১.২ ব্যবধান তৈরির কৌশল

এই ব্যবধানের মূল কারণ হলো অর্থনৈতিক উৎপাদনের ধরণ। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে। এই খাত কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি মূলত সস্তা শ্রম এবং আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল।

বিপরীতে, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনাম প্রযুক্তির মাধ্যমে “সূচকীয়” (exponential) প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর এবং ভারী শিল্পের ওপর ফোকাস করে তারা বাণিজ্যের শর্তাবলী (Terms of Trade) উন্নত করেছে। একটি টি-শার্টের চেয়ে একটি মাইক্রোচিপ বা জাহাজের মূল্য সংযোজন (Value-add) অনেক বেশি। এছাড়া, এই শিল্পগুলো থেকে অর্জিত জ্ঞান অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে—একটি ইলেকট্রনিক্স কারখানার জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ান প্রয়োজন, যার জন্য উন্নত স্কুল দরকার, যা পরবর্তীতে ভালো প্রকৌশলী তৈরি করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানভিত্তিক জাতীয়তাবাদ

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৬০-এর দশকে কোরিয়া অনেক সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশের চেয়েও দরিদ্র ছিল। ১৯৬১ সালে তাদের মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ৮২ ডলার 5। তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না এবং উত্তর থেকে ক্রমাগত নিরাপত্তার হুমকি ছিল।

কোরিয়ান সরকার বুঝতে পেরেছিল যে শিল্পায়ন চিরকাল বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে না। তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি শেখা, অভিযোজন এবং উদ্ভাবনের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। ১৯৬৬ সালে সরকার KIST প্রতিষ্ঠা করে। এটি কোনো সাধারণ তাত্ত্বিক গবেষণাগার ছিল না, বরং এর লক্ষ্য ছিল কোরিয়ান শিল্পের প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করা। সরকার কোরিয়ান বিজ্ঞানীদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, আবাসন এবং আন্তর্জাতিক মানের বেতন প্রদান করে 6। এই “রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন” বা মেধা ফিরিয়ে আনার নীতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোরিয়ার পক্ষে সব বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে একসঙ্গে উন্নতি করা সম্ভব ছিল না। তাই সরকার “নির্বাচন এবং একাগ্রতা” (Selection and Concentration) কৌশল গ্রহণ করে। তারা জাহাজ নির্মাণ, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত এবং কনজিউমার ইলেকট্রনিক্সের মতো কৌশলগত খাতগুলো চিহ্নিত করে এবং স্যামসাং, হুন্দাই ও এলজি-র মতো চেবল (পারিবারিক মালিকানাধীন কনগ্লোমারেট) গুলোকে বিপুল আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। তবে এই সহায়তার শর্ত ছিল কঠোর—তাদের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হবে। ১৯৮০ সালে কোরিয়ার গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) ব্যয় ছিল জিডিপির ০.৭৭%। ১৯৯৪ সালের মধ্যে তা বেড়ে ২.৩৩% হয় 7। বর্তমানে এটি ৫.২%-এর বেশি, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ 8।

কোরিয়ার শিক্ষার প্রতি অদম্য আগ্রহ সর্বজনবিদিত। প্রথমদিকে ভোকেশনাল ট্রেনিং বা কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হলেও পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ব্রেইন কোরিয়া ২১ (BK21) প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হয়, যা স্যামসাং বা হুন্দাইয়ের মতো কোম্পানির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল সরবরাহ করে 6।

মালয়েশিয়ান টাইগার – ইলেকট্রনিক্স, অবকাঠামো এবং মধ্যম আয়ের ফাঁদ

মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) এবং “অ্যাসেম্বলার” বা সংযোজনকারী থেকে “ইনোভেটর” বা উদ্ভাবক হওয়ার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে শিক্ষা নিতে পারি। ১৯৭০-এর দশকে পেনাং তার মুক্ত বন্দরের মর্যাদা হারানোর পর অর্থনৈতিক স্থবিরতার মুখে পড়ে। এর জবাবে ১৯৭২ সালে ‘বায়ান লেপাস ফ্রি ট্রেড জোন’ প্রতিষ্ঠা করা হয় 9। ইন্টেল, এএমডি এবং এইচপি-র মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সেখানে কারখানা স্থাপন করে। পেনাং ধীরে ধীরে শ্রমঘন সংযোজন শিল্প থেকে দক্ষতানির্ভর টেস্টিং ও ডিজাইনের কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা বর্তমানে “প্রাচ্যের সিলিকন ভ্যালি” নামে পরিচিত 10। ১৯৯৬ সালে মালয়েশিয়া মাল্টিমিডিয়া সুপার করিডোর (MSC) চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল মালয়েশিয়াকে তথ্য প্রযুক্তির যুগে নিয়ে যাওয়া। ২০২১ সালের মধ্যে দেশটির ডিজিটাল অর্থনীতি জিডিপিতে ২২.৬% অবদান রেখেছে 11।

মধ্যম আয়ের ফাঁদ: একটি সতর্কবার্তা

এত সাফল্য সত্ত্বেও মালয়েশিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে সংগ্রাম করছে। এর প্রধান কারণ দেশীয় উদ্ভাবনের অভাব। মালয়েশিয়া প্রযুক্তির ব্যবহারকারী এবং সংযোজনকারী হিসেবে সফল হলেও প্রযুক্তির মূল স্রষ্টা হতে পারেনি 12।

● গবেষণা ব্যয়: মালয়েশিয়ার R&D ব্যয় জিডিপির প্রায় ১.০%, যা কোরিয়ার (৫%+) তুলনায় অনেক কম 8।
● মেধা পাচার: মেধার সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় অনেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিভা সিঙ্গাপুর বা পশ্চিমা বিশ্বে চলে যাচ্ছে 13।

ভিয়েতনামের হাই-টেক কৌশল

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হলো ভিয়েতনাম। গত এক দশকে হাই-টেক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে বহু যোজন পেছনে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ যখন পোশাক শিল্পের জন্য বিনিয়োগ খুঁজছিল, ভিয়েতনাম তখন ইলেকট্রনিক্সের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। স্যামসাং ভিয়েতনামে ১৭.৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে এবং বর্তমানে ভিয়েতনামের মোট রপ্তানির এক-চতুর্থাংশই আসে স্যামসাং থেকে 14। স্যামসাংকে অনুসরণ করে ইন্টেল, এলজি এবং ফক্সকন সেখানে কারখানা স্থাপন করেছে, যা একটি বিশাল সাপ্লাই চেইন ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে14।

ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় চমক তাদের শিক্ষাব্যবস্থা। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া সত্ত্বেও, OECD-এর PISA টেস্টে ভিয়েতনামের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা গণিত ও বিজ্ঞানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের চেয়েও ভালো ফলাফল করে 15।

সারণী ২: PISA পারফরম্যান্স এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
Science and Technology of Global Bangladesh
উৎস: ওইসিডি PISA ফলাফল বিশ্লেষণ 17। ভিয়েতনামের এই সাফল্যের মূল কারণ শিক্ষকদের উচ্চমান এবং পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞান ও গণিতের ওপর কঠোর গুরুত্বারোপ।

ভিয়েতনাম ডিজিটাল অর্থনীতিকে তাদের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে জিডিপির ২০% এই খাত থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে 18। হাই-টেক কোম্পানিগুলোর জন্য তারা ১০% কর্পোরেট ট্যাক্স রেট (সাধারণ ২০%-এর পরিবর্তে) অফার করে, যা দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তির সক্ষমতা অর্জনে তাদের সদিচ্ছার প্রমাণ 20।

বাংলাদেশ প্যারাডক্স – ডিজিটাল স্বপ্ন বনাম কাঠামোগত বাস্তবতা

“ডিজিটাল বাংলাদেশ” নামের বড় বড় স্বপ্নের কথা বলে হলেও আমরা পরবর্তিতে উপলব্ধি করতে পারি যে এইগুলি মূলত ব্যবহৃত হয়ে অর্থ পাচারের জন্য। তারপরেও রূপকল্পের অধীনে বাংলাদেশ কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইন্টারনেট সংযোগ এবং আইটি খাত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এশীয় প্রতিবেশীদের সাথে তুলনা করলে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিম্নে সমস্যাগুলি আলোচনা করা হল:

গবেষণা ও উন্নয়নের (R&D) ঘাটতি: সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো গবেষণায়। বাংলাদেশে R&D খাতে ব্যয় জিডিপির মাত্র ০.৪% 8। নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন তো দূরের কথা, বর্তমান প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও এটি অপর্যাপ্ত। তুলনামূলক ভাবে আমরা উল্লেককরতে পারি যে, ভিয়েতনাম ব্যয় করে ~০.৫৩%, মালয়েশিয়া ~১.০%, এবং কোরিয়া >৫% 8।

ডিজিটাল বৈষম্য: ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭.৭ কোটির বেশি হলেও (২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী পেনিট্রেশন ৪৪.৫%) 21, শহর ও গ্রামের মধ্যে তীব্র বৈষম্য রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (৩৬.৫%) শহরের (৭১.৪%) প্রায় অর্ধেক 22। এছাড়া ইন্টারনেটের গতি এবং ডিজিটাল দক্ষতার অভাবও প্রকট।

ফ্রিল্যান্সার ট্র্যাপ: বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছে 23। এটি গর্বের বিষয় হলেও এখানে একটি ঝুঁকি রয়েছে। বেশিরভাগ কাজই লো-স্কিল বা স্বল্প দক্ষতার (যেমন ডেটা এন্ট্রি), যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া পেপ্যাল (PayPal) বা আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের অভাবে তারা তাদের আয় সহজে দেশে আনতে বা ব্যবসায়িক ঋণের সুবিধা পেতে বাধার সম্মুখীন হন 24।

বৈজ্ঞানিক মানসিকতার পুনজাগরণ

বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনের জন্য সরকারকে কেবল বিদেশের দিকে তাকাতে হবে না; বরং তাকাতে হবে বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যের দিকে। আমাদের মাটিতেই জন্ম নিয়েছেন জগদীশ চন্দ্র বসু এবং সত্যেন বোসের মতো বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীরা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেই অনেক মেধাবী গবেষক ও বৈজ্ঞানীক রয়েছে যারা বিদেশ থেকে পিএইচডি করে ফিরে এসেছেন। সেই লোকবলগুলিকে পরিচর্যা করে বৈজ্ঞানিক মানসিকতাকে পুনজাগরণ করতে হবে। এশীয় প্রতিবেশীদের সাথে ব্যবধান কমাতে এবং আমাদের বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে বাংলাদেশকে অবশ্যই তার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের আমূল সংস্কার করতে হবে। নিম্নে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সুপারিশ করা হল:

১: সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কাউন্সিল (NSTC): বিজ্ঞান নীতি কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। কোরিয়ান মডেল অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি NSTC গঠন করা প্রয়োজন, যা শিক্ষা, শিল্প, আইসিটি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে।

২: শিক্ষা বিপ্লব

শিক্ষক অগ্রাধিকার নীতি: ভিয়েতনামের সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের শিক্ষক সমাজ। একটি “জাতীয় শিক্ষক আইন” প্রণয়ন করা উচিত, যাতে STEM শিক্ষকদের বেতন বেসরকারি খাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে সমস্যা সমাধান এবং হাতে-কলমে শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।

৩: আর্থিক প্রণোদনা ও শিল্প নীতি

R&D ট্যাক্স সুপার-ডিডাকশন: বেসরকারি খাতে গবেষণায় উৎসাহিত করতে সরকারকে ২০০% ট্যাক্স ডিডাকশন বা কর অব্যাহতির ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ, কোনো কোম্পানি গবেষণায় ১ টাকা খরচ করলে করযোগ্য আয় থেকে ২ টাকা বাদ পাবে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর এই পদ্ধতি সফলভাবে ব্যবহার করেছে 20।

৪: ডিজিটাল ইকোসিস্টেম

পেমেন্ট গেটওয়ে সমস্যার সমাধান: ফ্রিল্যান্সার এবং স্টার্টআপদের জন্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সহজ করা এবং পেপ্যালের মতো প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি 25। পাশাপাশি, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নিশ্চিত করে “স্মার্ট ভিলেজ” ধারণা বাস্তবায়ন করতে হবে 30।

উপসংহার

১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশের যাত্রা হলো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার গল্প। এখন আমাদের লক্ষ্য নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনামের উদাহরণ প্রমাণ করে যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই পারে একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করতে। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু এবং সত্যেন বোসের উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সেই সম্ভাবনা সুপ্ত আছে। শিক্ষা, গবেষণা এবং সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলাই হবে “স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১”-এর মূল চাবিকাঠি। বিজ্ঞানের ওপর গুরুত্বারোপ কেবল একটি অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটি আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর লড়াই।

লেখকের পরিচয়: ড. মশিউর রহমান সিঙ্গাপুর প্রবাসী বৈজ্ঞানিক এবং লেখক। বর্তমানে ডিজিটাল হেল্থকেয়ারে সেক্টরে কাজ করেন। একটি জাপানিজ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত। পাশাপাশি biggani.org নামে একটি ডিজিটাল ম্যাগাজিনের সম্পাদক যেখানে বাংলদেশি বিজ্ঞানীদের গবেষণাকে নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।
ড. মশিউর রহমান

লেখকের পরিচয়:

ড. মশিউর রহমান সিঙ্গাপুর প্রবাসী বৈজ্ঞানিক এবং লেখক। বর্তমানে ডিজিটাল হেল্থকেয়ারে সেক্টরে কাজ করেন। একটি জাপানিজ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত। পাশাপাশি biggani.org নামে একটি ডিজিটাল ম্যাগাজিনের সম্পাদক যেখানে বাংলদেশি বিজ্ঞানীদের গবেষণাকে নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

তথ‍্যসূত্র

1. SMART Bangladesh Vision 2041: Concept of a Sustainable Developed Country, accessed December 17, 2025,
2. Indiana Journal of Economics and Business Management Research Article Smart Bangladesh: Bridging Technology and Economy for a Br, accessed December 17, 2025,
3. International Monetary Fund – World Economic Outlook (October 2025) – GDP per capita, current prices, accessed December 17, 2025,
4. List of countries by past and projected GDP (nominal) per capita – Wikipedia, accessed December 17, 2025,
5. Excelsior: The Korean Innovation Story – Issues in Science and Technology, accessed December 17, 2025,
6. Korea’s Science and Technology Manpower Policy:, accessed December 17, 2025,
7. Korean Focus Areas: A global powerhouse in science and technology | OECD, accessed December 17, 2025,
8. R&D spending (% of GDP) data – Lowy Institute Asia Power Index, accessed December 17, 2025,
9. Culturing Pearl of the Orient – Ministry of Investment, Trade and Industry, accessed December 17, 2025,
10. [Big read] Penang leads Malaysia’s semiconductor charge – ThinkChina, accessed December 17, 2025,
11. Chapter 5 Malaysia’s Digital Economy: Policies and Challenges for the ASEAN Economic Community 2045 – ERIA, accessed December 17, 2025,
12. Can Malaysia Escape the Middle-Income Trap? A Strategy For Penang – ResearchGate, accessed December 17, 2025,
13. Footnotes to a Nation: The Systemic Denial of Indigenous Access to Education, Healthcare, and Identity in Malaysia – Human Rights Research Center, accessed December 17, 2025,
14. Rags to Riches: Vietnam’s Growing Electronics Industry – SEMI, accessed December 17, 2025,
15. PISA 2022 Results (Volume I and II) – Country Notes: Viet Nam | OECD, accessed December 17, 2025,
16. PISA 2018: A Few Reactions to the New Global Education Rankings, accessed December 17, 2025,
17. Well Begun, But Aiming Higher: A Review of Vietnam’s Education Trends in the Past 20 Years and Emerging Challenges – PMC – PubMed Central, accessed December 17, 2025,
18. Vietnam – Digital Economy – International Trade Administration, accessed December 17, 2025,
19. Placing science, technology, innovation, and digital transformation at centre of new growth model – English, accessed December 17, 2025,
20. CIT Incentives for Software Production and High-Tech Companies in Vietnam, accessed December 17, 2025,
21. Digital 2024: Bangladesh — DataReportal – Global Digital Insights, accessed December 17, 2025,
22. Zero digital divide still a far cry for Bangladesh | The Business Standard, accessed December 17, 2025,
23. The Best Platform for Freelancing in Bangladesh – Jobbers, accessed December 17, 2025,
24. A Study to Find Out the Skills Gap in IT Freelancing to Create Employability and Boost Remittance, accessed December 17, 2025,
25. Six-Figure Remote Income: Still ‘Too Risky’ for Credit Cards in Bangladesh – Elevate Pay, accessed December 17, 2025,
26. Jagadish Chandra Bose proved plants feel, built Marconi’s radio, and refused patents, accessed December 17, 2025,
27. Centre for Studies in Science Policy: “India’s Jagadish Chandra Bose is the Reason why the World will Enjoy Superfast 5G Internet” – Research Blog, accessed December 17, 2025,
28. Satyendra Nath Bose – Father of Bosons – Vidyarthi Vigyan Manthan, accessed December 17, 2025,
29. Hidden in the Quill: Satyendranath Bose – The Bengal Gazette, accessed December 17, 2025,
30. Bridging the Digital Divide in Bangladesh Through Innovative WiFi Solutions, accessed December 17, 2025,